Vows and Rules of all gods: সর্ব দেব-দেবীর ব্রতকথা

বিশ্বাস করা হয় যে ব্রত পালন করলে সংসারের সকল বিপদ কেটে যায়, শান্তি সমৃদ্ধি জীবনে বৃদ্ধি পায়। এই নিবন্ধে আমরা কিছু দেবদেবীর ব্রতকথা, ব্রত-উপকরণ, ফল ও নিয়ম (Vows and rules of all gods and goddesses) উল্লেখ করেছি।

Table of Contents

Vows and rules of all Gods: ব্রতকথা, ব্রত-উপকরণ, ফল ও নিয়ম

Vows and rules of all gods and goddesses

|| Vows and Rules of all Gods: সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রত ||

ব্রতের নিয়ম- জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর নাম সাবিত্র চতুর্দশী। ঐ দিন উপোস করে যথা নিয়মে সাবিত্রীদেবীর পূজা করে আহুতি দান করতে হয়। ব্রত শেষে ব্রাহ্মণকে ভোজন করিয়ে দক্ষিণা দিতে হয়। এই ব্রত সধবাদের জন্য নির্দিষ্ট। ব্রতের আগের দিন হবিষ্য করে থাকতে হয়। এই ব্রত চোদ্দো বছরে উপযাপন করতে হয়। উদযাপনের পরের দিন লাঙ্গলের পূজা করতে হয়। এছাড়া সধবা ও ব্রাহ্মণভোজন সাধ্যমত করাতে হয়।

ব্রতের উপকরণ- সিঁদুর, পঞ্চগুঁড়ি, পঞ্চগব্য, ফুল, তুলসী, দুর্বা, বেলপাতা, ধূপ, দীপ, ধুনো, বটডাল, আম্রশাখা, হরীতকী, ৭টি কাপড় বা গামছা, ৭টি আসনাঙ্গুরীয়, ৭টি মধুপর্কের বাটি, চিনি, দধি, গাওয়া ঘি, পাখা, ১৫খানি নৈবেদ্য, ১টি কুঁচা নৈবেদ্য, ১৪টি সাজি, ফল মূল, ডোর, ভোজ্য, বালি, যজ্ঞকাষ্ঠ পূর্ণপাত্র ইত্যাদি।

ব্রতের ফল- যে নারী নিষ্ঠা সহকারে এই ব্রত পালন করে, তার স্বামী নীরোগ দেহে ও সুস্থ শরীরে দীর্ঘ জীবন লাভ করে থাকে এবং সেই নারীকে বৈধব্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না।

ব্রতকথা (Sabitri Chaturdashi Vrat)- মদ্র দেশের রাজা ছিলেন অশ্বপতি। তাঁর মেয়ের নাম সাবিত্রী। চোদ্দো বছর নিঃসন্তান অশ্বপতি সাবিত্রীদেবীর আরাধনা করে এই সর্ব সুলক্ষণা কন্যালাভ করেছিলেন বলে সাবিত্রীদেবীর নামেই কন্যার নামকরণ করেন।

সাবিত্রী যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে তপোবনে একদিন ভ্রমণ করতে গিয়ে শাল্বদেশের রাজপুত্র সত্যবানকে মনে মনে স্বামীরূপে বরণ করেন। দেবর্ষি নারদ এই ঘটনা জানার পর অশ্বপতিকে বললেন-সাবিত্রী ঠিক পাত্রই নির্বাচন করেছে, কিন্তু সত্যবান অল্পায়ু।

বিবাহের এক বৎসর পরেই তার মৃত্যু নিশ্চিত। অশ্বপতি মহাভাবনায় তিনি কন্যাকে অনেক বোঝালেন। কিন্তু সাবিত্রী অবিচল থেকে বললেন, যাকে একবার মন দিয়েছি, তাকে ছাড়া আমি আর কিছুই জানি না। তার যা গতি হবে, তাই আমি মাথা পেতে নেব। যথা সময়ে উভয়ের বিবাহ হয়ে গেল।

সাবিত্রী-চতুর্দশী-ব্রত

রাজকন্যা সাবিত্রী তপোবনে আশ্রমবাসিনী হয়ে স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন, আর নারদের কথামতো দিন গুণতে লাগলেন। দেবর্ষির বাক্য অনুসারে আর মাত্র তিনদিন বাকি। সাবিত্রী শ্বশুর-শাশুড়ির অনুমতি নিয়ে ব্রত আরম্ভ করলেন। নির্দিষ্ট দিনে সত্যবান কাঠ সংগ্রহ করতে রওনা হলে সাবিত্রীও তাঁর সঙ্গ নিলেন।

বনে এসে কাঠ সংগ্রহ করতে করতে হঠাৎ সত্যবান শিরঃপীড়ায় অস্থির হয়ে সাবিত্রীর কোলে ঢলে পড়লেন। দেখতে দেখতে সেখানে স্বয়ং যমরাজ উপস্থিত হয়ে সত্যবানের দেহ থেকে অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ প্রাণ বের করে নিজের পুরীর দিকে রওনা হলেন। সঙ্গে সঙ্গে সাবিত্রীও ছুটলেন যমরাজের পিছু পিছু।

যমরাজ তাকে ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু সাবিত্রী কিছুতেই তাঁর পিছু ছাড়েন না। শেষ অবধি সাবিত্রীর অনেক কাকুতিমিনতি যমরাজ উপেক্ষা করতে পারেন না। সাবিত্রী যমরাজের নিকট প্রার্থনা করেন, শ্বশুর-শাশুড়ির চক্ষু দান করুন। যমরাজ তথাস্তু বলে পুনরায় রওনা হলেন।

কিন্তু আবার সাবিত্রী তাঁর পিছু নিয়েছে দেখে তিনি বললেন, সাবিত্রী তোমার আর একটি প্রার্থনা আমি পূরণ করব, তুমি ফিরে যাও। কিন্তু তোমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে পারব না।

সাবিত্রী বললেন, আমার শ্বশুর রাজ্যচ্যুত হয়েছেন, তাঁকে তাঁর রাজ্য ফিরিয়ে দিন। যমরাজ বললেন, তাই হবে। তুমি এখনও কেন ফিরে যাচ্ছ না? ঠিক আছে তোমার স্বামীর প্রাণ ছাড়া আর একটি বর প্রার্থনা করো। সাবিত্রী বললেন, আমার পিতা অপুত্রক, তাঁকে আপনি শতপুত্র দিন। যমরাজ বললেন, তাই হবে।

এবার তুমি ফিরে যাও। এ কি। তুমি এখনও কেন আমাকে অনুসরণ করছ? আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার স্বামীর জীবন ছাড়া আর একটি বর প্রার্থনা করো। সাবিত্রী বললেন, বেশ আপনি আমাকে এই বর দিন, সত্যবানের ঔরসে আমি যেন শতপুত্রের জননী হই।

যমরাজ কিছু না চিন্তা করেই বললেন, তথাস্তু। তারপর বললেন, এবার তুমি ফিরে যাও। সাবিত্রী বললেন, স্বামীকে না নিলে শতপুত্রের জননী হব কি করে? যমরাজ সতীর সঙ্গে বুদ্ধির খেলায় হেরে গেলেন। কাজেই সত্যবানের প্রাণবায়ু তাঁকে ফিরিয়ে দিতে হল।

এইভাবে সতী সাবিত্রী অন্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনলেন, শ্বশুরকে হৃতরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করলেন, অপুত্রক পিতাকে শতপুত্রের জনক করলেন এবং নিজের মৃত স্বামীকে জীবিত করলেন।

সাবিত্রী চতুর্দশী ব্রত সমাপ্ত

|| Vows and Rules of all Gods: ইতুপূজা ব্রত ||

ব্রতের নিয়ম- কার্তিক সংক্রান্তির দিন একটি পরিষ্কার সরার মাঝখানে ঘট স্থাপন করে তার চারদিকে হলুদ, ধান, মান ও কচুগাছ একটি করে বসাতে হবে। মটর, সরিষা, সুষনি, কলমি ও পাঁচটি ছোট বটশাখা সেই সঙ্গে রাখতে হবে। পূজা শেষে এই মন্ত্রটি বলে প্রণাম করতে হয়। 

প্রণাম মন্ত্র- অষ্ট চাল, অষ্ট দূর্বা, কলস পাত্রে থুয়ে। শোনরে ইতুর কথা এক মনপ্রাণ হয়ে।। ইতু দেন বর। ধনে-ধান্যে পুত্রে বাড়ুক তাদের ঘর।

অঘ্রায়ন মাসের প্রতি রবিবারে এই ব্রত করে অঘ্রাণ সংক্রান্তির দিন নদী, পুষ্করিণী বা গঙ্গায় ইতু বিসর্জন দেবার বিধি। যে কোনো একজনকে উপবাসী থেকে ইতুর ব্রতকথা শুনতে হয়।

ব্রতের উপকরণ- সিঁদুর, ফল, দূর্বা, বেলপাতা, তিল, হরীতকী, দীপ, ধূপ, সেঁয়াকুল, ফল ও নৈবেদ্য।

ব্রতের ফল- এই ব্রত করলে রমণীগণ অতুল ঐশ্বর্য ও সুখ-সম্পদের অধিকারিণী হয়ে থাকে।

ব্রতকথা (Etu Puja Vrat)- এক দেশে এক ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী বহু কষ্টে ভিক্ষে করে দিন কাটাত। তাদের দুই মেয়ে ছিল উমনো ও ঝুমনো নামে। ব্রাহ্মণের একদিন পিঠে খেতে সাধ হল। ব্রাহ্মণ ভিক্ষে করে পিঠের জোগাড় করে সন্ধ্যেবেলায় ব্রাহ্মণীকে দিল।

ব্রাহ্মণী রাত্রিতে পিঠে তৈরি করতে লাগল। ব্রাহ্মণ রান্নাঘরের পাশে বসে গুণতে লাগল। পিঠে তৈরি হয়ে গেলে বামুন খেতে বসল। ব্রাহ্মণী তাকে পিঠে এনে দেয়। দুইটি পিঠে কম দেখিয়া ব্রাহ্মণ রাগে জ্বলিয়া ওঠে। ব্রাহ্মাণী ভয় পেয়ে তখন ব্রাহ্মণকে বলে আমি দুটি মেয়েকে দুটি পিঠে দিয়েছি। এরপর একদিন ব্রাহ্মণ এসে ব্রাহ্মণীকে বলল, আমি কন্যা দু’জনকে পিসীর বাড়ি নিয়ে যাব। একথা শুনে ব্রাহ্মণী খুবই দুঃখ পেল বটে কিন্তু ভয়ে ব্রাহ্মণকে কিছু বলতে পারে না।

তখন ব্রাহ্মণ কন্যা দু’জনকে নিয়ে পথ হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে কন্যা দু’জন ক্ষুধা-পিপাসায় কাতর হয়ে একটি গাছের তলায় বসে পড়ে। কিছুক্ষণ পরে তারা দু’জনেই সেখানে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই সুযোগে ব্রাহ্মণ সে স্থান ত্যাগ করে চলে যায়।

ইতুপূজা ব্রত

কন্যাদ্বয়ের ঘুম ভেঙে যেতেই ভাবতে লাগল কোথা পিতা বলি ডাকতে থাকে। উমনো বলে বাবাকে বুঝি বাঘে খেয়েছে। ঝুমনো বলে পিতা মোদের ত্যাগ করে চলে গেছে। আমরা পিঠে খেয়েছিলাম বলে সেই রাগে আমাদের পিতা আমাদেরকে বনবাসে রাখিয়া গেল।

রাত কেটে সকাল হল। সামান্য পিঠে খেয়ে এত যন্ত্রণা। এখন আমরা কোথায় যাব ভাবতে ভাবতে পথ চলতে লাগল। যেতে যেতে তারা দেখতে পায় দূরে কতকগুলি মেয়ে পূজা করছে।

উমনো-ঝুমনো সে স্থানে যাওয়া মাত্রই পূজার ঘটটি উলটে পড়ে গেল। তখন অন্য মেয়েরা রাগে অস্থির হয়ে কন্যাদ্বয়কে বলে তোমরা অলক্ষ্মী এখানে এসেছ। উমনো-ঝুমনো তাদেরকে নিজেদের কাহিনী সব বলে। তখন অন্য মেয়েরা দুই বোনকে ইতু ব্রত করতে বলে। এর ফলে সব দুঃখ ঘুচে যাবে।

এই কথা শুনে দু’জন তৎক্ষণাৎ স্নান করে ইতু ব্রত করে। ব্রতশেষে উমনো ও ঝুমনো বলে আমার বাবা-মার দুঃখ দূর করো। ধনেধান্যে যেন গৃহ পূর্ণ হয়ে যায়। বর দাও যেন সব ইচ্ছা পূরণ হয়। তারপর ইতু ঘট নিয়ে দুই বোন বাড়িতে আসিয়া দেখে ইতুর কৃপাতে ধনৈশ্বর্য পেয়ে বাবা-মা আনন্দে বাস করছে। কন্যাদ্বয়ে দ্বিজ দেখিয়া বলিল, এতদিন পর তোরা কোথা থেকে এলি।

কন্যাদ্বয় অভিমানে পিতাকে বলিল, তোমরা ধনী হইয়াছ, মোদের কারণেই। ইতু ব্রত করি মোরা অতি ভক্তিভরে। ব্রাহ্মণী এতক্ষণ গৃহ মধ্যে ছিল, বাহির হইয়া কন্যাদ্বয়কে মাতৃস্নেহে বুকে টেনে নেয়। কন্যাদ্বয় কহিল, মাতা ভক্তিভরে ইতু ব্রত করো প্রতি রবিবারে। ইতুর কৃপায় সংসারে দুঃখ-কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা সব দূর হয়ে যাবে।

ইতুপূজা ব্রত সমাপ্ত

|| Vows and Rules of all Gods: অক্ষয়তৃতীয়া ব্রত ||

অক্ষয়তৃতীয়া ব্রত

ব্রতের নিয়ম- বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে এই ব্রত করতে হয়। যব দিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণের পূজা করে-ভোজ্য, জলপূর্ণ কলসী, তালপাতার পাখা, নতুন কাপড় বা গামছা ব্রাহ্মণকে দান করতে হয়। পরপর আট বছর এই ব্রত পালন করে শেষে উদ্যাপন করার বিধি।

ব্রতের উপকরণ- কিছু যব, একটি ভোজ্য, একখানি তালপাতার পাখা, একখানি নতুন কাপড় ও একটি জলপূর্ণ কলসী প্রয়োজন হয়। এগুলিই এই ব্রতের উপকরণ।

উদ্যাপন বৎসরে প্রত্যেক বস্তু সংখ্যায় আটটি হিসাবে ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা সহ দান করতে হবে। এই দিন যবের ছাতু খেয়ে দিন-রাত কাটাতে হয়। ব্রতের ফল-এই ব্রত বহুকাল যাবৎ এ দেশে প্রচলিত। এই ব্রত স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের জন্যেই নির্দিষ্ট। এই ব্রত উদ্যাপন করলে সকল রকমের পার্থিব যশ সৌভাগ্যের অধিকারী হয়ে মৃত্যুর পরে বৈকুণ্ঠ প্রাপ্তি হয়।

অক্ষয়তৃতীয়া ব্রত সমাপ্ত

|| Vows and Rules of all Gods: তালনবমী ব্রত ||

তালনবমী ব্রত

ব্রতের নিয়ম- ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে এই ব্রত করতে হয়। পর পর ন’বছর করে শেষে উদ্যাপন করতে হয়। পিষ্টক প্রভৃতি দিয়ে নারায়ণের ভোগ দিয়ে ব্রতশেষে ব্রাহ্মণভোজন করিয়ে, নিজ নিজ স্বামীগণকে আহার করিয়ে, তারপর নারীগণ নিজে আহার করবে।

ব্রতের উপকরণ- ঘট, দীপ, ধূপ, ফুল, নৈবেদ্য, নয়টি ফল, তাল, মিষ্টান্ন। উদ্যাপনের দিন ব্রাহ্মণকে একখানি নববস্ত্র ও একটি টাকা দক্ষিণা ধরে দিতে হয়। ব্রতের ফল-এই ব্রত করলে নারীগণ স্বামী-সোহাগিনী হয়ে সুখে কাল যাপন করতে সক্ষম হয়।

ব্রতকথা (Talnabami Vrat)- শ্রীকৃষ্ণের রুক্মিণী ও সত্যভামা নামে দুই রানী ছিলেন। এঁদের ভেতর শ্রীকৃষ্ণ রুক্মিণীকে একটু বেশি ভালবাসতেন। সে জন্য সত্যভামা মনে মনে দুঃখ পোষণ করতেন। একদিন সত্যভামা ব্যথিত হৃদয়ে এক তপোবনে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তপোবনে এক সন্ন্যাসী বাস করতেন। সত্যভামা সন্ন্যাসীকে তাঁর মনের কষ্টের কথা বললেন। সন্ন্যাসী বললেন, আমি এক ব্রতের কথা জানি, সেই ব্রত করলে স্বামী-সোহাগিনী হওয়া যায়। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথিতে লক্ষ্মী-জনার্দনের পূজার মধ্যে দিয়ে এই ব্রত উদ্যাপন করতে হয়। এই ব্রতের নাম তালনবমী ব্রত। এই ব্রতের প্রধান অঙ্গ তালফল দান। ন’বছর এই ব্রত পালন করে শেষে উদ্যাপন করতে হয়। সত্যভামা গৃহে ফিরে নয় বছর এই ব্রত পালন করে উদ্যাপন করেন ও শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় হন।

তালনবমী ব্রত সমাপ্ত

|| Vows and Rules of all Gods: রামনবমী ব্রত ||

ব্রতের নিয়ম- এইদিন উপবাসী থেকে শ্রীরামচন্দ্রের পূজা ইত্যাদি করে গঙ্গাতীরে পিতৃপুরুষের তর্পণ করতে হয়। পরদিন অর্থাৎ দশমীর দিন ব্রাহ্মণভোজন ও ব্রতকথা শ্রবণ করে জলযোগের মাধ্যমে পারণ করার নিয়ম।

ব্রতের উপকরণ- পঞ্চগুঁড়ি, পঞ্চগব্য, তিল, হরীতকী, ফুল, দূর্বা, তুলসী, বেলপাতা, ফুলমালা, ধূপ, দীপ, ধূনা, দধি, মধু, চিনি, ঘৃত, রামচন্দ্রের ধুতি, সীতার ও কৌশল্যার শাড়ি, আসনাঙ্গুরীয়, মধুপর্কের বাটি, নৈবেদ্য, কুঁচা নৈবেদ্য, উপকরণ, ভোগের দ্রব্য ও দক্ষিণা।

রামনবমী ব্রত

ব্রতকথা (Ramanvami Vrat)- মহারাজ দশরথ ছেলেপুলে না হওয়ার জন্য রঘুবংশ রক্ষার চিন্তায় অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত কুলগুরু বশিষ্ঠ উপদেশ দিলেন সস্ত্রীক শিবদুর্গা মন্ত্র জপ করে যাবার জন্যে। দশরথ তখন প্রধানা মহিষী কৌশল্যাকে নিয়ে অত্যন্ত ভক্তি সহকারে দীর্ঘকাল ধরে ঐ মন্ত্র জপ করতে লাগলেন। রাস্ত্র দশরথের শ্রদ্ধাভক্তিতে মহেশ্বর ভোলানাথের হৃদয় বিগলিত হল। তিনি তাঁকে দর্শন দিয়ে বললেন- বৎসে, তোমার মনোবাসনা অবশ্যই পূর্ণ হবে। তুমি অবিলম্বে পুত্র্যেষ্টি-যজ্ঞের অনুষ্ঠান করো। 

রাজা দশরথ যজ্ঞের আয়োজন করলেন। তারপর এক শুভদিনে এই ব্রত যজ্ঞ সুসম্পন্ন হল। সেই যজ্ঞের চরু খেলেন দেবী কৌশল্যা। অল্পকালের মধ্যেই রানীর মধ্যে গর্ভের লক্ষণ দেখা দিল। রাজা দশরথ আনন্দিত হলেন। যথাসময়ে কৌশল্যার গর্ভ থেকে স্বয়ং জনার্দন রামরূপে আবির্ভূত হলেন। অযোধ্যা নগরীতে উৎসবানন্দের বন্যা বয়ে যেতে লাগল চারদিকে। শ্রীরামচন্দ্রের পবিত্র আবির্ভাবের দিন, তাই এই দিনটির নাম রামনবমী। এই দিনটিকে স্মরণীয় রাখবার জন্যেই এই ব্রত।

ব্রতের ফল- এই ব্রত নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যে নির্দিষ্ট। এই ব্রত উদ্যাপন করলে কৃতী পুত্রের জনক-জননী হয়ে জীবনে সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করা যায়।

রামনবমী ব্রত সমাপ্ত

|| Vows and Rules of all Gods: রাধাষ্টমী ব্রত ||

ব্রতের নিয়ম- ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে এই ব্রত করতে হয়। ব্রতের দিন উপবাসী থেকে শ্রীরাধিকা, ললিতা, বিশাখা প্রভৃতি অষ্টসখী ও বৃষভানু, নন্দ প্রভৃতির পূজা দিতে হবে। ব্রতের পরদিন ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণবগণকে ভোজন করিয়ে আশীর্বাদ নিতে হয়।

ব্রতের উপকরণ- গন্ধ, পুষ্প, আতপচাল, সিদ্ধচাল, নৈবেদ্য, আট রকমের আটটি ফল।

ব্রতের ফল- এই ব্রত বাঞ্ছিতকে লাভ করার এবং সংসারকে সুখময় করার প্রকৃত উপায়।

রাধাষ্টমী ব্রত

ব্রতকথা (Radhastami Vrat)- এক সময়ে সূর্যদেব মন্দার পর্বতে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণের আরাধনায় নিমগ্ন হলেন। সূর্যের অভাবে ত্রিলোক অন্ধকার, দেবগণ উৎকণ্ঠিত হয়ে কৃষ্ণের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। বললেন, বাসুদেব উপায় করুন।

শ্রীকৃষ্ণ মন্দার পর্বতে গিয়ে সূর্যকে দর্শন দিয়ে বললেন, তোমার তপস্যায় আমি তুষ্ট, তুমি বর প্রার্থনা করো। তখন সূর্যদেব বললেন, আমাকে একটি কন্যারত্ন দান করুন, তবে এমন কন্যা, চিরদিন যার বশে স্বয়ং আপনি অবস্থান করবেন।

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, তথাস্তু। তারপরে আরও বললেন, আমি একমাত্র রাধিকা ভিন্ন অন্য কোনো নারীতে বশীভূত নই। আমি পৃথিবীভার লাঘবের জন্য শ্রীধাম বৃন্দাবনে নন্দালয়ে প্রতিপালিত হব, আর তারই অদূরে গোকুলে তুমি রাজা বৃষভানুরূপে জন্মগ্রহণ করবে এবং তারপর তোমার অভিলাষ পূর্ণ হবে।

তারপর একদিন সূর্যদেব রাজা বৃষভানুরূপে জন্ম নিলেন। সুলক্ষণা গোপকন্যা সুকীর্তির সঙ্গে তাঁর বিবাহ হল। তারপর ভাদ্রমাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে অনুরাধা নক্ষত্রে সুকীর্তির গর্ভে এক রূপবতী কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। ইনিই শ্রীরাধিকা।

শ্রীরাধা আয়ান ঘোষের সঙ্গে পরিণীতা হলেন। কিন্তু যৌবনের প্রারম্ভ লগ্নেই তিনি পরস্ত্রী হয়েও শ্রীকৃষ্ণকে পরম পুরুষ জ্ঞানে তার সঙ্গ কামনায় ব্যাকুল হলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গোপনে বিহার করতে লাগলেন। কালক্রমে রাধা ও কৃষ্ণ অভিন্ন হয়ে গেলেন। রাধা তুষ্ট হলেই কৃষ্ণ তুষ্ট। বৈষ্ণব সাধকগণ বিধান দিলেন, যদি কৃষ্ণকে পরিতুষ্ট করতে চাও, তাহলে শ্রীরাধিকার জন্মলগ্নে রাধাষ্টমী ব্রত উপযাপন করো।

রাধাষ্টমী ব্রত সমাপ্ত

|| Vows and Rules of all Gods: জন্মাষ্টমী ব্রত ||

ব্রতের উপকরণ– সিদ্ধি, সিঁন্দুর, তিল, হরীতকী, পঞ্চশস্য, পঞ্চগুঁড়ি, পুষ্পাদি, বস্ত্র ২, আসনাঙ্গুরীয় ২, মধুপর্কবাটি ২, নৈবেদ্য ১, কুচা নৈবেদ্য ১, ভোগের দ্রব্য, আরতির দ্রব্য, দধি, দুগ্ধ, মধু, চিনি, গোময়, গোচনা, তৈল, হরিদ্রা, গুড়, বালি, কাষ্ঠ, খোড়কে, গব্যঘৃত, পূর্ণপাত্র, ভোজ্য, দক্ষিণা।

ব্রতের নিয়ম- ব্রতের পূর্বদিন সংযমী থাকিয়া ও হবিষ্যান্ন গ্রহণ করিয়া, তার পরদিন প্রাতঃস্নান করিয়া নিত্যক্রিয়া সমাধাপূর্বক নারায়ণশিলার সম্মুখে শুদ্ধাসনে পূর্ব বা উত্তরমুখে উপবেশন করিয়া আচমন ও করযোড়ে বিষ্ণুস্মরণ করিবেন।

আচমন- ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণুঃ, ওঁ বিষ্ণু, মন্ত্র পাঠপূর্বক আচমন করিয়া করজোড়ে বিষ্ণুস্মরণ করিবেন। বিষ্ণুস্মরণ-ওঁ তদ্বিষ্ণো পরমং পদং, সদা পশ্যন্তি সুরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্। ওঁ অপবিত্র পবিত্রবা সর্বাবস্থাং গতোহপিবা। যঃ স্মরেৎ পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তর শুচি।। ওঁ সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যং বরেণ্যং বরদং শুভম্। নারায়ণং নমস্কৃত্য সর্বকর্মাণি কারয়েৎ।।

জন্মাষ্টমী ব্রত

জন্মাষ্টমী ব্রতকথা (janmashtami vrat)

নারায়ণং নমস্কৃত্য নরঞ্চৈব নরোত্তমম্। 

দেবীং সরস্বতীঞ্চৈব ততো জয় মুদীরয়েৎ।। 

একদা দিলীপ রাজা বসি সিংহাসনে। 

নানা আলোচনা করে পাত্রমিত্র সনে।। 

সহসা বশিষ্ঠ মুনি তথায় আসিল। 

মুনিরে দেখিয়া রাজা আনন্দিত হৈল। 

পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া রাজা তুষিল মুনিরে। 

তুষ্ট হয়ে মুনি বসে সভার মাঝারে।। 

অতঃপর মহারাজ করজোড়ে কর। 

এক প্রশ্ন মনে মোর হয়েছে উদয়।। 

ব্যাকুল হয়েছি আমি জানিতে ঘটনা। 

কৃপা করি পূর্ণ কর মনের বাসনা।। 

কি কারণে নারায়ণ গোলক ত্যজিয়া। 

জন্মেছিল পূর্ণব্রহ্ম মর্ত্যেতে আসিয়া।। 

শুনিয়া বশিষ্ঠ বলে শুন হে রাজন। 

মহাপুণ্যময় ঘুরায় ছিল রাজা কংস নামধারী। 

মহাপরাক্রান্ত আর কথা করাব শ্রবণ।। 

মথুরায় অতি অত্যাচারী।। 

দেবতা ব্রাহ্মণে ভক্তি ছিল না তাহার। 

প্রজাগণ প্রতি সদা করে অত্যাচার।। 

একদিন সভামধ্যে কংস বসেছিল। 

সহসা নারদ ঋষি তথায় আসিল।। 

নারদে দেখিয়া কংস পরম যতনে। 

পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া তাঁরে বসায় ‘আসনে।। 

ঋষি বলে কহ রাজা রাজ্যের কুশল। 

কংস বলে ঋষিবর সকলি মঙ্গল।। 

দেবকী নামেতে ছিল কংসের ভগিনী। 

ভক্তিমতী তিনি বসুদেবের গৃহিণী।। 

বসুদেব দেবকীর প্রসঙ্গ উঠিল। 

শুনিয়া নারদ তাহা বিষাদিত হৈল।। 

কংস রাজা বলে ঋষি কিসের কারণ। 

দেবকীর কথা শুনি বিষাদিত মন।। 

দেবর্ষি নারদ বলে শুন হে রাজন। 

ভাগিনেয় হস্তে হবে তোমার মরণ।। 

এত বলি ঋষিবর সভা ত্যাগ কৈল।

 নারদের কথা শুনি কংস ভীত হৈল।। 

পরদিন কংস রাজা বসিয়া সভায়। 

পাত্র মিত্রগণে বলে কি হবে উপায়।। 

শেষে কংস ভেবে চিন্তে না দেখি উপায় ।। 

দেবকীরে কেশে ধরি কাটিবারে যায়। 

বসুদেব বলে কংসে বিনয় বচনে।’ 

নারীহত্যা কর রাজা কিসের কারণে।। 

সর্বশাস্ত্র বিশারদ তুমি হও জ্ঞানী। 

কেন কর নারী হত্যা বল দেখি শুনি। 

কংস বলে বসুদেব করহ শ্রবণ। 

দেবর্ষি যা বলেছেন সেই বিবরণ।। 

দেবকীর অষ্টম গর্ভে যে পুত্র জন্মিবে। 

সেইপুত্র একদিন মোরে বিনাশিবে। 

শুনিয়া সান্ত্বনা করি বসুদেব কয়। 

নারী বধে মহাপাপ ওহে নররায়। 

দেবকীর পুত্র হলে তোমা দিব দান। 

অবলায় না বধিয়া রাখহ পরাণ। 

এত শুনি মনে মনে ভাবিল রাজন। 

ইহারে বধিয়া মোর কিবা প্রয়োজন।। 

দেবকীর গর্ভে যত সন্তান জন্মিবে। 

সেই শিশু লয়ে বধ করিব যে তবে।। 

অতঃপর কংস বসুদেব দেবকীরে। 

বন্দী করি রাখি দিল লৌহ কারাগারে।। 

বক্ষেতে চাপায় আনি দারুণ পাষাণ। 

বসুদেব দেবকীর আকুল পরাণ।। 

হস্ত পদ বাঁধি রাখে লৌহ শৃঙ্খলেতে। 

সশস্ত্র প্রহরী রাখে কারার দ্বারেতে। 

দিবানিশি স্মরে দোঁহে কোথা আছ হরি। 

কারামুক্ত কর প্রভু ভব ভয়হারী।। 

কারাগারে দেবকীর সাত পুত্র হৈল। 

একে একে কংস সবে বিনাশ করিল।। 

নানা অত্যাচার করে কংস নরপতি। 

অত্যাচারে জর্জরিতা হৈল বসুমতী। 

নিপীড়িতা বসুমতী কাঁদিতে কাঁদিতে। 

মহাদেব পাশে গিয়া লাগিল বলিতে।। 

শুন ওহে মহেশ্বর পার্বতীর পতি। 

কংস অত্যাচারে মোর এতেক দুর্গতি। 

ধরিত্রীর দশা হেরি দেব ত্রিলোচন। 

ক্রোধেতে হইল তাঁর আরক্ত লোচন।। 

ধরিত্রীর সম্বোধিয়া মহেশ্বর কয়। 

যাও সতী প্রতিকার করিব নিশ্চয়। 

ভক্তিভরে প্রণমিয়া মহেশ চরণে। 

বসুন্ধরা ফিরে যান আপনার স্থানে।। 

পার্বতীরে লইয়া শিব ব্রহ্মা পাশে যায়। 

ব্রহ্মার নিকটে গিয়া সকলি জানায়।। 

সব কথা শুনি ব্রহ্মা বলেন শঙ্করে। 

কারও সাধ্য নাই জেনো কংসে বধিবারে। 

একটি উপায় আছে ওহে পঞ্চানন। 

কংসকে বধিতে পারে নিজে নারায়ণ।।

 ক্ষীরোদ সাগরে তিনি আছেন শয়ানে। 

চল যাই তাঁর কাছে লয়ে দেবগণে।। 

এত বলি ব্রহ্মা দেবগণেরে ডাকিল। 

দেবগণ ব্রহ্মলোকে উপস্থিত হৈল।।

ব্রহ্মলোকে উপস্থিত হয়ে দেবগণ। 

কংসের বৃত্তান্ত সবে করিল শ্রবণ।।

দেবগণে লয়ে ব্রহ্মা গমন করিল। 

নারায়ণ পাশে গিয়া উপনীত হৈল।।

অনন্ত শয্যায় প্রভু ক্ষীরোদ সাগরে। 

দেবগণ গিয়া সেথা স্তব স্তুতি করে।।

প্রণমি চরণে দেব অখিলের প্রতি। 

কৃপা করি ধরিত্রীর ঘুচাও দুর্গতি।। 

তুমি নিত্য নিরঞ্জন ভব ভয়হারী। 

ত্রিলোক পালন কর্তা তুমি হে শ্রীহরি ॥ 

দুষ্টের দমন কর্তা ওহে নারায়ণ। 

বারে বারে ভক্তে তুমি করেছ রক্ষণ।। 

এবে দেবগণে রক্ষা করহে মুরারি। 

কংস ধ্বংস কর প্রভু সুদর্শন ধারী।। 

নরলোক প্রতি প্রভু চাহ একবার। 

কংস অত্যাচারে সবে করে হাহাকার।। 

পাপে পরিপূর্ণ পৃথ্বী রসাতলে যায়। 

তুমি ছাড়া কে রক্ষিবে এই ঘোর দায়।।

দেবতার স্তব স্তুতি শুনি নারায়ণ। 

ধীরে ধীরে চাহিলেন মেলিয়া নয়ন।।

মৃদু হাস্য করি প্রভু বলে দেবগণে।। 

ব্যাকুল হয়েছ সবে কিসের কারণে।।

ব্রহ্মা মহেশ্বর দাঁড়াইয়া যুক্ত করে। 

কংসের বৃত্তান্ত সব জানায় তাঁহারে।।

শুনি তাহা, দেবগণে বলে নারায়ণ। 

ভাগিনেয় হস্তে হবে কংসের নিধন।। 

অতঃপর যাও সবে নাহি কোন ভয়। 

কংস নাশ হেতু আমি করিব উপায়।। 

শুন বলি মহাদেব আমার বচন। 

ভগবতী সঙ্গে মোর করিবে গমন।। 

জন্ম লব কারাগারে দেবকী গর্ভেতে। 

মহামায়া জনমিবে যশোদা গর্ভেতে। 

এইরূপ পরামর্শ করি দেবগণ। 

নিজ নিজ স্থানে সবে করেন গমন।। 

অতঃপর দেবকীর অষ্টম গর্ভেতে। 

বৈকুণ্ঠ ত্যজিয়া বিষ্ণু এলেন মর্ত্যেতে। 

দেবকীর অষ্টম গর্ভে লৌহ কারাগারে।

 নারায়ণ জন্মিলেন কংস নাশিবারে।। 

হেথায় গোকুল মাঝে নন্দের গৃহেতে। 

ভগবতী জন্মিলেন যশোদা গর্ভেতে। 

একে একে দশ মাস দশ দিন গেল। 

প্রসব সময় আসি উপনীত হৈল।। 

ভাদ্রমাস কৃষ্ণপক্ষ অষ্টমী সে তিথি। 

রোহিণী নক্ষত্রযুক্ত অন্ধকার রাতি।। 

ভীষণ দুর্যোগময় রাত্রি ভয়ঙ্কর। 

ঝম ঝম বারিধারা ঝরে নিরন্তর ।। 

শশূন্ ঝড় বহে ভীষণ গর্জনে। 

ভয়ঙ্কর শব্দে বাজ পড়ে ক্ষণে ক্ষণে। 

অন্তঃপুরে নিদ্রাগত ছিল কংসরায়। 

চমকি উঠিয়া ভাবে হইবে প্রলয়। 

এ হেন দুর্যোগ মাঝে অবনী মাঝারে। 

জন্মিলেন নারায়ণ কংস কারাগারে।। 

পরিধানে পীতবাস কৌস্তুভ গলেতে। 

শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম চারিটি হস্তেতে।। 

পুত্র দেখি বসুদেব দেবকী চিন্তিল। 

নারায়ণ মর্ত্যে আসি জনম লভিল।। 

স্তব স্তুতি করি তারা বলে নারায়ণে। 

চারিহস্ত পরিহার করুন এক্ষণে।। 

কেমনে রক্ষিব তোমা কংস হাত হতে। 

ভাবিয়া উপায় মোরা নাই পাই চিতে।। 

অন্তর্যামী নারায়ণ সকলি বুঝিল। 

চারিহস্ত পরিহার দ্বিভুজ হইল।। 

তারপর বসুদেব বিষ্ণুর মায়ায়। 

শৃঙ্খল হইতে মুক্তি সেইক্ষণে পায়।। 

মায়াময় শ্রীহরির আশ্চর্য মায়াতে। 

রক্ষীগণ অচৈতন্য হইল নিদ্রাতে।। 

হেথা বৃন্দাবন মাঝে নন্দের ভবনে। 

ভগবতী ভূমিষ্ঠ হলেন সেইক্ষণে। 

কারাগারে বসুদেব দেবকী তখন। 

পুত্র কোলে লয়ে করে অশ্রু বিসর্জন।। 

এইরূপে দুইজনে কাঁদিতে লাগিল। 

হেনকালে কারাগারে দৈববাণী হৈল।। 

শুন বলি বসুদেব আমার বচন। 

পুত্রলয়ে বৃন্দাবনে করহ গমন।। 

নন্দালয়ে যশোদার কন্যা হইয়াছে। 

ত্বরা করি যাও তুমি যশোদার কাছে। 

পুত্রেরে রাখিয়া তথা লইয়া কন্যারে। 

পুনরায় ফিরে এসো কংস কারাগারে। 

দৈববাণী বসুদেব শুনি নিজ কানে।

পুত্র লয়ে ব্রজে যায় অতীব যতনে। 

অচেতন রক্ষীগণ বিষ্ণুর মায়ায়। 

আপনা-আপনি কারাদ্বার খুলে যায়।। 

অন্ধকার চারিদিক বেগে ঝড় বয়। 

পুত্র লয়ে বসুদেব সাবধানে যায়।। 

যমুনার তীরে আসি উপনীত হয়। 

কেমনে হইবে পার নাহিক উপায়।। 

জলে পরিপূর্ণ নদী ভীষণ আকার। 

খরতর স্রোত তাহে বহে অনিবার।। 

উত্তাল তরঙ্গময়ী যমুনার পারে। 

কিরূপে হইবে পার ভাবিছে অন্তরে।। 

সহসা শৃগাল এক পার হয়ে গেল। 

তাহা দেখি বসুদেব জলেতে নামিল।। 

কৃষ্ণে হেরি সে যমুনা আনন্দ অন্তরে। 

সাধ হ’ল কৃষ্ণ সনে ক্রীড়া করিবারে। 

অন্তর্যামী ভগবান মনেতে জানিল। 

বসুদেব ক্রোড় হতে জলেতে পড়িল।। 

দেখি তাহা বসুদেব লাগিল কাঁদিতে। 

জলমধ্যে পুত্রে তার লাগিল খুঁজিতে।। 

নারায়ণ বসুদেবে কাতর দেখিয়া। 

ক্রীড়া সাঙ্গ করি প্রভু উঠিল ভাসিয়া।। 

বসুদেব তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিল। 

যমুনা হইয়া পার নন্দালয়ে এল।। 

পুত্র দিয়া কন্যা লয়ে অতি যত্ন করে। 

বসুদেব আসে পুনঃ কংস কারাগারে। 

প্রাতে কংস দূতমুখে পাইল শুনিতে। 

কন্যা এক হইয়াছে দেবকী গর্ভেতে।। 

সংবাদ পাইয়া কংস কারাগারে এল। 

কন্যা লয়ে পাষাণেতে আছাড় মারিল।। 

পাষাণে না পড়ি কন্যা উঠি শূন্যোপরে। 

কংসেরে ডাকিয়া কন্যা বলে উচ্চৈঃস্বরে।। 

শোন্ ওরে দুষ্ট কংস আমার বচন। 

তোরে যে নাশিবে আছে গোকুলে এখন।। 

শুনি তাহা কংসরাজ মহা ভয় পায়। 

শ্রীকৃষ্ণে বধিতে করে অনেক উপায় ।। 

কিন্তু কিছুতেই কৃষ্ণে বধিতে নারিল। 

নারদ আসিয়া শেষে কংসে যুক্তি দিল।। 

পরামর্শ পেয়ে কংস যজ্ঞ আরম্ভিল। 

নিমন্ত্রণ পেয়ে কৃষ্ণ বলরাম এলো। 

বধ করি রাম কৃষ্ণ কুবল হস্তীরে। 

দুই ভাই ধেয়ে এল যজ্ঞসভা দ্বারে। 

চানুর মুষ্টিক নামে দুই মল্ল ছিল। 

রাম কৃষ্ণ তাহাদের বিনাশ করিল।। 

প্রকাণ্ড ধনুক এক ছিল যজ্ঞাগারে। 

কৃষ্ণ তাহে গুণ দিয়া কণ্ড খণ্ড করে।।

 যজ্ঞস্থলে প্রবেশিয়া শ্রীকৃষ্ণ তখন। 

নিজ হস্তে কংসরাজে করিল নিধন। 

কংসে বধি রাম কৃষ্ণ কারাগারে গেল। 

বসুদেব দেবকীরে কারামুক্ত কৈল।। 

দেবকী ও বসুদেব কারামুক্ত হয়ে। 

করিল কৃষ্ণের স্তব ভক্তিযুক্ত হয়ে।। 

এইরূপে ধরাভার করিতে মোচন। 

দেবকীর গর্ভেতে জন্মিলেন নারায়ণ।।

শ্রীকৃষ্ণ জন্মের তত্ত্ব অতি পুণ্যময়। 

এ তত্ত্ব শ্রবণে সর্ব পাপ নাশ হয় ।। 

ভক্তাধীন ভগবান ভক্তের কারণে। 

যুগে যুগে এসেছেন এই ধরাধামে। 

মহাপাপী কংসরাজে উদ্ধার করিতে। 

জন্মিলেন নররূপে দেবকী গর্ভেতে।। 

কৃষ্ণ হস্তে প্রাণ দিয়া কংস নররায়। 

পুষ্পরথে দিব্যদেহে বৈকুন্ঠেতে যায়।। 

এই তো শুনিলে ওহে দিলীপ রাজন। 

শ্রীকৃষ্ণ জন্মের তত্ত্ব অপূর্ব কথন।। 

এই ব্রত যেইজন করে ভক্তিভরে। 

সপ্ত জনমের পাপ যায় তার দূরে।। 

যেই মূঢ় এই ব্রত না করে পালন। 

মনুষ্য কুলেতে তার বৃথাই জনম।। 

ভক্তাধীন হয় সেই দেব দয়াময়। 

মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় তাঁহার কৃপায় ।। 

যদি কেহ একবার কৃষ্ণ বলে ডাকে। 

সকল বিপদে কৃষ্ণ রক্ষা করে তাকে।। 

দুষ্টের দমন আর ভক্তে রক্ষিবারে। 

অবতীর্ণ হয়েছেন মর্ত্যের মাঝারে । 

যখনি ধর্মের গ্লানি উপনীত হয়। 

ধর্ম রক্ষা লাগি আসে কৃষ্ণ দয়াময়।। 

কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি যেবা ডাকে বার বার। 

অবহেলে চলে যায় ভবসিন্ধু পার।। 

ভক্তগণ বলে সবে কৃষ্ণ দয়াময়। 

অন্তিম কালেতে দিও চরণে আশ্রয় ।। 

জন্মাষ্টমী ব্রতকথা হৈল সমাপন। 

হরি হরি হরি বল যত ভক্তগণ।। 

হরি বিনে মুক্তি নাই ইহা জেনো সার। 

তাই বলি হরি বলে ডাক বার বার ।।

জন্মাষ্টমী ব্রত সমাপ্ত

|| Vows and Rules of all Gods: জিতাষ্টমী ব্রত ||

ব্রতের নিয়ম- আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বাড়ির উঠোনে ছোট আকারের একটি পুকুর খুঁড়ে তার মাবাখানে কলাচারা ও বেলচারা পুঁতে সারাদিন স্বামী-স্ত্রী উপবাসে থেকে পুরোহিত দিয়ে এই ব্রত উদ্যাপন করে ব্রত শেষে ব্রতকথা শুনে জলযোগ করতে হয়।

ব্রতের উপকরণ- নানা প্রকার ফল, ভিজে মটর কলাই, আতপচালের নৈবেদ্য, দীপ, ধূপ, ফুল ইত্যাদি।

ব্রতের ফল (Jitastami Vrat)- এই ব্রত পালন করলে বন্ধ্যা নারীও পুত্রলাভ করে। 

ব্রতকথা- সেকালে শালিবাহন নামে এক পরম ধার্মিক রাজা ছিলেন। তাঁর রানীও ছিলেন অতি ধর্মপরায়ণা, গুণে গুণবতী আর দেখতেও ছিলেন অতীব সুন্দরী। কিন্তু রাজা-রানীর মনে কোনো সুখ ছিল না, কারণ তাঁরা ছিলেন নিঃসন্তান। একদিন রাত্রে রানী স্বপ্ন দেখলেন, একজন দেবতা হাঁসের পিঠে চড়ে এসে তাঁকে বলছেন, তুমি জিতাষ্টমী ব্রত পালন করো, তা হলেই তোমার ছেলে হবে।

মঙ্গলচণ্ডী ব্রত

পরদিন সকালে রানী ঘুম থেকে উঠে রাজাকে স্বপ্নের কথা বললেন। স্বপ্নে সেই দেবতা যেমন বলেছিলেন, সেই নিয়ম অনুসারে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে রাজা উঠোনে একটা ছোট পুকুর কাটলেন, সেই পুকুরের মধ্যিখানে কলাগাছ ও ফলের নৈবেদ্য সাজিয়ে রাজা-রানী সমস্ত দিন উপবাস থেকে জিতাষ্টমী ব্রত উদ্যাপন করলেন এবং পূজার শেষে একটি পুত্র ও একটি কন্যা বর চাইলেন।

কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের একটি পুত্র ও একটি কন্যা জন্মগ্রহণ করল। ক্রমে ক্রমে ছেলেমেয়ে বড় হল। তারপর এক শুভদিনে ছেলে ও মেয়ের ভাল ঘরে ও বরে বিয়ে দিলেন। রাজা-রানী প্রতি বছর নিয়মিত ব্রত করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের ছেলের বউ এসব ব্রত দেখে আড়ালে মুখ টিপে হাসে ও শাশুড়িকে নানা টিটকারি পর্যন্ত করে। এদিকে ছেলের বউয়ের প্রায় প্রতি বছরই ছেলেপুলে হয় অথচ একটু বড় হতে না হতেই তারা মারা যায়।

শাশুড়ি বউমাকে তখন বললেন, এক কাজ করো বউমা, তুমি জিতাষ্টমী ব্রত করো। দেখবে আর তোমার ছেলেপুলে মরবে না। বউমা তো তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ও সব ব্রত-ট্রত আমার দ্বারা হবে না। শেষে শাশুড়ি তাকে অনেক করে বুঝিয়ে রাজি করালেন। 

তারপর থেকে বউমার যতগুলি ছেলেপুলে হল, একটিও মরল না। সেই থেকে দেশে দেশে এই ব্রতের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল।

জিতাষ্টমী ব্রত সমাপ্ত

Leave a Comment